ভারতের ব্যাংক খাতে বিদেশী বিনিয়োগ দ্রুত হারে বাড়ছে। দেশটির সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখন বিদেশী প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বিস্তারকে শিথিল দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে। সেই সুযোগ নিতে বড় আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো স্থানীয় ব্যাংকের শেয়ার কিনতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আগ্রহী। খবর এফটি।
ডাটা পরিষেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিলোজিকের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর ভারতের আর্থিক খাতে বিদেশী বিনিয়োগ-সংক্রান্ত চুক্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮০০ কোটি ডলারে। আগের দুই বছরে চুক্তির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ২৩৭ ও ১৪০ কোটি ডলার।
বিনিয়োগের এ উল্লম্ফন ভারতীয় অর্থনীতির প্রতি ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা। মুম্বাইভিত্তিক মোতিলাল ওসওয়াল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বলছে, এসব চুক্তি ভারতের ব্যাংক খাতে নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে।
ভারত সরকার খাতটি আরো শক্তিশালী করতে বড় আকারের ব্যাংক গঠনে জোর দিচ্ছে। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) একক বিদেশী বিনিয়োগকারীর জন্য বেসরকারি ব্যাংকে ১৫ শতাংশ মালিকানা সীমা শিথিল করার বিষয়ে পর্যালোচনা করছে। যদিও এরই মধ্যে পৃথকভাবে কয়েকটি বড় চুক্তি অনুমোদন দিয়েছে আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারক প্রতিষ্ঠানটি।
চলতি বছরে ভারতের আর্থিক খাতে বিদেশী বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উদাহরণ রত্নাকর ব্যাংক লিমিটেডের (আরবিএল) ৬০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি। দুবাইভিত্তিক এমিরেটস এনবিডি এসব শেয়ার ৩০০ কোটি ডলারে কিনেছে।
একই সময়ে ইয়েস ব্যাংকের ২৪ দশমিক ২ শতাংশ শেয়ার প্রায় ১৭০ কোটি ডলারে অধিগ্রহণ করেছে জাপানের সুমিতোমো মিৎসুই ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ। এতে প্রতিষ্ঠানটি ইয়েস ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার হয়ে ওঠে।
জাপানের আরেক বড় ব্যাংক মিৎসুবিশি ইউএফজে ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপ (এমইউএফজি) ভারতের কয়েকটি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বড় বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এমইউএফজি চেন্নাইভিত্তিক শ্রীরাম ফাইন্যান্সে প্রায় ২৬০ কোটি ডলারের একটি সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে কথা বলছে। তবে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘এখনো কিছু ঠিক হয়নি। আলোচনা চলছে। যেকোনো মুহূর্তে পরিবর্তন হতে পারে।’
এমকেই গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের প্রধান নির্বাহী যতিন সিং বলেন, ‘ভারতের শক্তিশালী জিডিপি প্রবৃদ্ধি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। জাপানের মতো দেশগুলোয় এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম এবং মূলধন বেশি। তারা ঝুঁকির তুলনায় বেশি রিটার্ন পাওয়া যায় এমন বাজার খুঁজছে। সে হিসেবে ভারত খুব আকর্ষণীয়।’
সাধারণত দুরবস্থায় থাকা ব্যাংককে ঘিরে পরিচালিত হতো ভারতের ব্যাংক খাতের একীভূতকরণ। তবে আইনি প্রতিষ্ঠান জেএসএর সিনিয়র পার্টনার বিক্রম রাঘানি বলেন, ‘নিয়ন্ত্রকদের মনোভাব এখন বদলাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক মূলধন ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে যেতে হলে ব্যাংকগুলোর বড় আকারের মূলধন এবং আন্তর্জাতিক দক্ষতা প্রয়োজন।’
একই সঙ্গে শ্যাডো-ব্যাংক খাতে আগ্রহ বাড়ছে। ২০২৩ সালে অতিরিক্ত ঋণ বিতরণের কারণে আরোপিত বিধিনিষেধ আরবিআই শিথিল করার পর আবারো খাতটিতে বিনিয়োগ বাড়ছে। চলতি বছরে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং কোম্পানি ভারতীয় শ্যাডো-ব্যাংক সম্মান ক্যাপিটালের ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার ১০০ কোটি ডলারে কিনেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের আর্থিক খাত এখন মোটামুটি স্থিতিশীল। এ খাতে শেয়ার মূল্যায়ন ভারতের সামগ্রিক বাজারের তুলনায় এখনো তুলনামূলক কম।
গোল্ডম্যান স্যাকসের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সামগ্রিক শেয়ারবাজারে কোম্পানিগুলো আগামী ১২ মাসে যে পরিমাণ আয় করতে পারে, তার ২৩ গুণ দামে শেয়ার লেনদেন হচ্ছে। আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেন হচ্ছে তুলনামূলক কম বা সম্ভাব্য আয়ের ১৭ গুণ দামে।
এমকেই গ্লোবালের যতিন সিং বলেন, ‘ভারতে ঋণের চাহিদা যথেষ্ট। যে খাতেই তাকাবেন, আগামী ১৫-২৫ বছরে বড় সুযোগ দেখবেন। এখন যারা ব্যাংকে বিনিয়োগ করছেন, তারা দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই করছেন।’